‘শব’-এর অর্থ রাত এবং ‘কদর’-এর দুটি অর্থ। যথা :
এক. মাহাত্ম্য ও সম্মান। এ রাতের মাহাত্ম্য, সম্মান ও বৈশিষ্ট্যের কারণে একে ‘শবে কদর’ বা সম্মানিত রজনী বলা হয়।
দুই. তাকদির ও আদেশ। এ রাতে পরবর্তী এক বছরের মানুষের হায়াত, মউত, রিজিক প্রভৃতি যাবতীয় বিষয় (তথা ভাগ্য) লওহে মাহফুজ থেকে নকল করে সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাদের কাছে সোপর্দ করা হয়। তাই এ রাতকে ‘শবেকদর’ বা ‘ভাগ্য রজনী’ বলা হয়।
শবেকদরের ফজিলত
শবেকদর এই উম্মতের একটা বৈশিষ্ট্য; অন্যান্য উম্মতকে এই রাতের ফজিলত দেওয়া হয়নি।
শবেকদরের বিশেষ ৪টি ফজিলত রয়েছে। যথা :
১ম ফজিলত : এ রাতে পবিত্র কুরআন লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আসমানে নাযিল হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআন শরিফে বলেন- ‘নিশ্চয় এই কুরআনকে আমি শবে কদরে নাযিল করেছি।’
২য় ফজিলত: এ রাতটি হাজার মাস (অর্থাৎ ৮৩ বৎসর ৪ মাস) অপেক্ষা উত্তম। এ সম্পর্কে আল্লাহতাআলা কুরআন শরিফে বলেন- ‘শবেকদর হাজার মাস (অর্থাৎ ৮৩ বৎসর ৪ মাস) অপেক্ষা উত্তম।’
৩য় ফজিলত: এ রাতে হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম ফেরেশতাদের দল সহ শান্তির পয়গাম নিয়ে দুনিয়াতে অবতরণ করেন। এ সম্পর্কে কুরআন শরিফে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘এ রাতে ফেরেশতাগণ এবং রুহুল আমীন হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম শান্তির পয়গাম নিয়ে দুনিয়াতে অবতরণ করেন।’
৪র্থ ফজিলত: এ রাতে যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর বিশ্বাস রেখে সওয়াবের আশায় ইবাদত-বন্দেগীতে মগ্ন থাকে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। এ সম্পর্কে হাদিস শরীফে রাসুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- ‘এ রাতে যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর বিশ্বাস রেখে এবং সওয়াবের আশায় ইবাদত-বন্দেগীতে মগ্ন থাকে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’
কোন রাত শবেকদর?
রমজান মাসের শেষ দশকের মধ্যে যে-কোনো বেজোড় রাতে শবেকদর হতে পারে। যেমন: ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাত।
বিশেষভাবে ২৭তম রাতের কথা বুজুরগানে দ্বীনের ইলহাম ও কাশফের দ্বারা বুঝা যায়; তবে তাও নিশ্চিত নয় এবং সব বছর এক রাতে নাও হতে পারে। তাই রমজানের শেষ দশকের সব রাতেই শবেকদর তালাশ করা চাই। অর্থাৎ এসব রাতে শবেকদরের আশায় বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি করা উচিত।
তবে বুখারি-মুসলিমের কয়েকটি হাদিসে শবেকদরের বিশেষ কিছু লক্ষণ বর্ণিত হয়েছে। যেমন- সে রাতে হালকা ধরনের বৃষ্টি হবে, পরের দিন সূর্য এমনভাবে উদিত হবে যে রশ্মিতে প্রখরতা ও তেজ থাকবে না।
শবেকদর অনির্দিষ্ট থাকার হিকমত
কোন রাত শবেকদর? তা নিশ্চিত করে বলার জন্য নবীজি ঘর থেকে বের হয়ে সাহাবিদের কাছে আসছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে দুজন মুসলমানের ঝগড়া শোনে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যেও অনেক হিকমত (মঙ্গল) রয়েছে :
১. শবেকদর নির্দিষ্ট থাকলে শবে কদরের আশায় তখন অন্য রাতেও মানুষ যে ইবাদত করে তা একেবারে ছেড়ে দিতো।
২. সব সময়ই কিছু কিছু লোকের গুনাহ হয়েই থাকে, এভাবে শবেকদরের মতো মহা মর্যাদাবান রাত জেনেও তারা গুনাহ করত আর ধ্বংস হয়ে যেত।
৩. শবেকদর নির্দিষ্ট থাকলে দুর্ভাগ্যবশত : যদি কারও সে রাতে ইবাদত করা হয়ে না উঠত, তাহলে সে চরম হতাশ হয়ে রাত্র জাগরণই একেবারে ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম হতো।
৪. এখন শবেকদর অনির্দিষ্ট থাকায় যত রাতই জাগরণ করবে, তার জন্য পৃথক পৃথক সওয়াব প্রাপ্ত হবে। হতে পারে শবেকদরের ফজিলত অর্জনের নিয়তে রাত্র জাগরণ করছে, বিধায় যত রাতেই জাগরণ করবে প্রতি রাতেই শবেকদরের সওয়াব প্রাপ্ত হবে। কেননা, আল্লাহপাক খাঁটি নিয়তের ভিত্তিতে সওয়াব প্রদান করে থাকেন।
শবেকদরে করণীয় আমলসমূহ
কুরআন ও হাদিসের আলোকে শবেকদর উপলক্ষ্যে আমাদের বিশেষ ২টা আমল করণীয় :
১. শবেকদরের ফজিলত পাওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু নফল নামাজ, তিলাওয়াত, জিকির ইত্যাদি যে-কোনো ইবাদত করা। কত রাকাত নফল বা কী কী সূরা দিয়ে পড়তে হবে তা নির্দিষ্ট নেই- যত রাকাত ইচ্ছা, যে সূরা দিয়ে ইচ্ছা নফল বা তাহাজ্জুতের নিয়তে পড়া যায়।
২. দুআ করা, বিশেষভাবে মাগফিরাতের দুআ করা। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। হযরত আয়েশা রা.কে নবীজি শবেকদরে এ দুআটি পড়তে শিক্ষা দিয়েছেন-
اَللّٰهُمَّ اِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّىْ.
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউন তুহিব্বুল আফওয়া, ফা‘ফু আন্নী।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! তুমি বড়ই ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসো; তাই আমাকে ক্ষমা করে দাও।’